নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং ১৬ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) খাদ্য মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার ও সেভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গে একত্রে বহুখাতীয় ও বহুপক্ষীয় এক কর্মশালার মাধ্যমে সর্বশেষ জাতীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ করে।
২০২৪ সালে একই বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে দেশে ২ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ উচ্চ মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। সরকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে ২০২৫ সালে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিশ্চিত করতে আরও জোরদার পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পরিচালিত এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশের ৩৬টি জেলা ও রোহিঙ্গা শিবিরের মোট ৯ কোটি ৬ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ আইপিসি ফেজ ৩ বা তারও উচ্চ পর্যায়ে থাকবে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার মানুষ ইমার্জেন্সি (ফেজ ৪) অবস্থায় থাকবে এবং তাদের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন হবে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা গেছে কক্সবাজারে—বিশেষত উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায়—যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ আইপিসি ফেজ ৩ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়াও সুনামগঞ্জ, বরগুনা, বান্দরবান, নোয়াখালী এবং সাতক্ষীরা জেলায় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বেশি এবং এই এলাকাগুলোর প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ ফেজ ৩ পর্যায়ে শ্রেণিভুক্ত। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯২ জন বিশ্লেষিত শরণার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্রাইসিস বা ইমার্জেন্সি অবস্থায় রয়েছে।
পুষ্টি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ৬–৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১৬ লাখ শিশু ২০২৫ জুড়ে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে বা ভুগতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৪ হাজার শিশুর অবস্থা মারাত্মক অপুষ্টি (এসএএম), যাদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন। একই সময়ে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন শিশু মাঝারি পর্যায়ের অপুষ্টিতে ভুগবে বলে পূর্বাভাস। এছাড়া ১ লাখ ১৭ হাজার গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীও তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এটাই প্রথমবার বাংলাদেশে আইপিসি অ্যাকিউট মালনিউট্রিশন বিশ্লেষণ করা হলো, যা ৭টি বিভাগের ১৮টি বিপদাপন্ন জেলা এবং রোহিঙ্গাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছে এই সর্বশেষ আইপিসি বিশ্লেষণ। ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং ১৬ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের বলেন, আইপিসি বিশ্লেষণের ফলাফল বিশেষ করে গ্রামীণ ও উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ, যাদের জীবিকা কৃষি ও মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ, এনজিও এবং প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতার মাধ্যমে এই আইপিসি বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে। আজকের কর্মশালায় বিভিন্ন অংশীজন বিশ্লেষণের ফলাফল নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নীতি সমন্বয় এবং জাতীয় পরিকল্পনায় ফলাফল প্রতিফলনের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।